আজ, শনিবার | ১০ই অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | রাত ২:০১

ব্রেকিং নিউজ :
বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস ২০২৬: শুনতে হবে মনের কথা মাগুরার কলেজপাড়া থেকে ২৮ হাজার পিস ইয়াবাসহ যুবক গ্রেপ্তার রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বীর মুক্তিযোদ্ধা টোকনের দাফন সম্পন্ন আওয়ামী লীগকে সঙ্গে নিয়ে ক্ষমতায় যেতে মরিয়া হয়ে উঠবে জামায়াত ডিজিটাল নজরদারিতে বদলে গেল শ্রীপুর সরকারি কলেজ ৮ হাজার পিস ইয়াবাসহ মাগুরার মাদকসম্রাট শাহীন আলম গ্রেপ্তার মাগুরায় বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষ্যে বর্ণাঢ্য র‍্যালি ও আলোচনা মাগুরায় ভোক্তা অধিকার অভিযানে ৫ প্রতিষ্ঠানকে ২১ হাজার টাকা জরিমানা ১২ কেজি এলপিজি ১,৮৩৭ টাকা, ভোক্তা পাবে কত টাকায়? মাগুরার ফটকি নদীতে নৌকা বাইচ দেখতে হাজার হাজার মানুষ

বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস ২০২৬: শুনতে হবে মনের কথা

লায়লা আরিয়ানি হোসেন : আমরা প্রতিদিন অসংখ্য কথা বলি, কিন্তু কতটা শুনি? যদি বা শুনি, বোঝার জন্য শুনি নাকি কিছু বলার জন্য? আমাদের আশেপাশে অনেক মানুষ আছেন, যারা নিজের কথাটা বলতে পারেন না বলে বুকের ভিতর চাপা কষ্ট নিয়ে বেঁচে থাকেন। একটা সময়ে অনেক মানুষের মাঝে থেকেও তারা নিঃসঙ্গ অনুভব করেন। তাঁদের কথাগুলো জমে থাকে ভেতরে, কারণ শোনার মতো কিংবা বলার মতো নিরাপদ জায়গা খুঁজে পাননি। এভাবে দিনের পর দিন বলতে না পেরে, চেপে রেখে, হতাশা থেকে অনেকে বিষাদগ্রস্ত হয়ে পড়েন। কারও কাছে মন খুলে কিছু বলার আগে জায়গাটি নিরাপদ হবে কিনা, এটাও মনের মাঝে ঘুরপাক খায়। আর আমাদের সাধারণ অভ্যাস—আমরা বলতে চাই, বলতে থাকি। অথচ বলা কথা ঠিকমতো কেউ শুনছে কিনা, এটাও জরুরি।

উঠতি বয়সে বা বয়ঃসন্ধিকালে অনেক কিছু জানার থাকে, বলার থাকে। কিন্তু ‘বললে কে কী ভাববে, বুঝবে কিনা’—এই দ্বিধা থেকে আর বলা হয় না। যিনি নতুন মা হয়েছেন বা মা হবেন, তাঁর মনে অনেক প্রশ্ন থাকে; কখনো ভীষণ অভিমান, কখনো অকারণেই রাগ হয়। কাজ ঠিকমতো হচ্ছে না, কাজের জায়গায় পরিবেশ বা সহকর্মী থেকে এমন পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে যা কাউকে বলা দরকার। প্রযুক্তির কারণে জীবনে এসেছে অনেক পরিবর্তন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম জীবনের সাথে জড়িয়ে আছে। এখানে দেখা কোনো খবর, কোনো ঘটনা, অনাকাঙ্ক্ষিত আক্রমণাত্মক কথা, সাইবার বুলিং বা অনলাইনে উত্ত্যক্ত করা বা হেনস্তা করা, অপমান-অসম্মানের মতো হাজারো পরিস্থিতি থাকে যেখানে কাউকে প্রয়োজন হয়। প্রথমত ও প্রধানত, কথা শোনার জন্য এমন কেউ প্রয়োজন, যে মন দিয়ে শুনবে; প্রয়োজনে দিকনির্দেশনা, সমাধানের পথ বা পরামর্শ দিতে পারবে এবং যার কাছে কথার নিরাপত্তা আর গোপনীয়তা থাকবে। কারণ এই সব পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেলে দীর্ঘমেয়াদি ভয়, অস্বস্তি ও নানা ধরনের সমস্যা তৈরি হয়, যা মানুষকে লম্বা সময় আটকে রাখে এক অদৃশ্য দেয়ালে।

বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস ১৯৯২ সাল থেকে পালিত হয়ে আসছে। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা এবং শারীরিক স্বাস্থ্যের মতো মানসিক স্বাস্থ্যকেও সমান গুরুত্ব দেওয়ার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে এটি পালিত হয়। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য “Lived Experiences Heard: Real Voices, Real Change”। শারীরিক স্বাস্থ্যের জন্য যেমন আছে প্রাথমিক চিকিৎসা, মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য এখন প্রয়োজন সমন্বিত ব্যবস্থা। সাইকোলজিস্ট ও সাইকিয়াট্রিস্ট মনের রোগের চিকিৎসা করে থাকেন; এর পাশাপাশি প্রাথমিক পর্যায়ে সহায়তা দেওয়ার জন্য শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ব্যবস্থা নিতে হবে।

“লিভড এক্সপেরিয়েন্স” বা জীবন্ত অভিজ্ঞতা মানে কোনো বই পড়ে বা তত্ত্ব মুখস্থ করে নয়, নিজের জীবনে কিছু বয়ে বেড়ানো এবং সেখান থেকে যা শেখা হয়েছে—অর্থাৎ ঘটে যাওয়া ঘটনা থেকে অর্জিত জ্ঞান। একজন মা যিনি সন্তান হারিয়েছেন, একজন তরুণ যিনি বছরের পর বছর বিষণ্ণতার সঙ্গে লড়েছেন, একজন নারী যিনি সংসারের চাপে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছেন—এঁদের প্রত্যেকের কাছে এমন জ্ঞান আছে যা কোনো পাঠ্যবইয়ে নেই। এই লেখায় আমরা দেখব—এই কণ্ঠগুলো শোনা কেন জরুরি, সাধারণ মানুষ বিষয়টিকে কীভাবে দেখেন, আমাদের বাস্তব অবস্থা কেমন, এবং মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি লাইফ কোচ, কাউন্সেলর, শিক্ষক ও অভিভাবকগণ কী করতে পারেন।

মানুষকে শোনা কেন জরুরি? শোনা মানেই স্বীকৃতি দেওয়া, গুরুত্ব দেওয়া। কেউ যখন মন দিয়ে শোনে, তখন যে বলে সে প্রাথমিকভাবে আস্থা ফিরে পায় ও সহজ হয়। অনেক মানুষের জন্য এই স্বীকৃতি, গুরুত্ব ও ভালো বোধ করার প্রথম ধাপ এটিই। অনেকে চায় শুধু তাকে কেউ শুনুক।
মানুষ অনেক সময় কষ্ট পায় যখন তার মনে হয়, “শুধু আমিই এমন।” অন্যের অভিজ্ঞতা শুনলে বোঝা যায়, “আমি একা নই।” এই উপলব্ধি লজ্জা ও অসহায়ত্ব কমায়।
সমস্যার আসল চেহারা বোঝা যায় যখন সেটা কাউকে বলা হয়। একই “মন খারাপ” একজনের কাছে কর্মক্ষেত্রের চাপ, আরেকজনের কাছে পারিবারিক টানাপোড়েন, আবার আরেকজনের কাছে পুরোনো কোনো ক্ষত। ধরে নিয়ে নয়, শুনেই কেবল জানা যায় কার ক্ষেত্রে কোনটা সত্যি। কার জন্য কোন সেবা প্রয়োজন, সেটা তখন নির্ধারণ করা যায়।

কথা বলতে শুরু করলেই যদি কারও মাঝে সন্দেহ বা বিচার করার মতো মনোভাব প্রকাশ পায়, তবে যে বলতে যায় সে আরও বেশি হতাশ হয়ে পড়ে। তাই শোনা বিশ্বাস তৈরি করে। যে মানুষ একবার অনুভব করে যে তাকে বিচার না করে শোনা হয়েছে, সে আবার সাহায্য চাইতে সাহস পায়।

সাধারণ মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকে যদি দেখা যায়, মানসিক স্বাস্থ্য ও আবেগের বিষয়টি নিয়ে আমাদের সমাজে কিছু প্রচলিত ভুল ধারণা আছে, যা অনেক সময় সাহায্য চাওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়:
• “এটা তো দুর্বলতা”—অনেকে মনে করেন কষ্টের কথা বলা মানে দুর্বল হওয়া। অথচ নিজের কষ্ট স্বীকার করতে সাহস লাগে।
• “সবারই তো সমস্যা আছে, মানিয়ে নাও”—এই কথায় ব্যক্তির অনুভূতি ছোট হয়ে যায়।
• “মানসিক সমস্যা মানেই পাগল”—এই ভুল ধারণা ও কলঙ্কের ভয়ে অনেকে সময়মতো সাহায্য নেন না।
• “লোকে কী বলবে?”—সামাজিক চাপ ও গোপনীয়তার ভয় মানুষকে চুপ থাকতে শেখায়।
• “ধর্মকর্ম করলে বা ব্যস্ত থাকলে ঠিক হয়ে যাবে”—বিশ্বাস ও কাজে ব্যস্ততা অনেকের জন্য শক্তির উৎস, কিন্তু সব ক্ষেত্রে এগুলো যথেষ্ট নয়।

তবে আশার কথা, তরুণ প্রজন্ম (বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে) এখন আগের চেয়ে খোলামেলা কথা বলছে। অনেকে নিজের গল্প শেয়ার করছেন, আর সেই গল্প পড়ে কেউ কেউ প্রথমবার ভাবছেন, “আমারও তো এমন হয়।” সাধারণ মানুষ মূলত চান এমন কাউকে, যিনি তাঁদের বিচার করবেন না, তাড়াহুড়ো করবেন না; যাঁর মাঝে থাকবে মনোযোগ, আগ্রহ আর সহমর্মিতা।
বাস্তব অবস্থা কী বলে? আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে কয়েকটি বাস্তবতা স্পষ্ট:
• প্রশিক্ষিত পেশাজীবীর সংখ্যা চাহিদার তুলনায় কম এবং বেশিরভাগ সেবা বড় শহরকেন্দ্রিক। গ্রাম ও মফস্বলের মানুষ প্রায়ই নাগালের বাইরে থেকে যান।

• খরচ ও সময় একটি বড় বাধা। নিয়মিত থেরাপি বা কাউন্সেলিং অনেক পরিবারের জন্য সাধ্যের বাইরে। মানুষ সাহায্য চাইতে দেরি করেন, আর তখন সমস্যা আরও জটিল হয়ে যায়।
• আমাদের সমাজে শোনার সংস্কৃতি দুর্বল। পরিবারে, কর্মস্থলে, এমনকি বন্ধুমহলেও আমরা প্রায়ই উপদেশ দিতে ব্যস্ত থাকি, শুনতে নয়। কেউ কিছু বলছে শুনলে আমাদের লক্ষ্য থাকে বেশিরভাগ সময় কী মন্তব্য করা যায়, তা নিয়ে।
• কারও কাছে দুর্বল মুহূর্তে কিছু বলে অনেকেই ভয়ে থাকেন—যদি কাউকে বলে দেয়, যদি সবার কাছে ছোট হতে হয়। অনেক সময় এমনটা ঘটেও থাকে।

এই সব পরিস্থিতি বিবেচনায় অনানুষ্ঠানিক সহায়তাকারীদের ভূমিকা বাড়ছে। কোচ, লাইফ স্কিল ট্রেইনার, কমিউনিটি লিডার, শিক্ষক, পিয়ার সাপোর্ট—অনেক মানুষ এখন এঁদের কাছেই প্রথম মন খোলেন। এই শেষ বিষয়টি একই সঙ্গে সুযোগ ও দায়িত্ব। যেহেতু মানুষ প্রথমে এঁদের কাছেই আসছেন, তাই এঁরা কীভাবে শোনেন, তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে।
এখন মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে অনেক কোর্স ও ট্রেনিং আছে, যেখানে শেখানো হয় কীভাবে ‘অ্যাক্টিভ লিসেনিং’ করতে হয়—অর্থাৎ কারও কথা শোনার সময় কী কী দিক মনে রাখতে হবে। যেমন: প্রশ্ন না করা, শুরুতেই শুনে নেওয়া যে তিনি উপদেশ বা পরামর্শ চাইছেন নাকি শুধুই বলতে পারলে তাঁর ভালো লাগবে। প্রশ্ন করলে এমন প্রশ্ন করা, যা তাঁর মাঝে নিজের সম্পর্কে আশা জাগাবে। কেউ যখন নিজের কথা বলবে, সমস্ত মনোযোগ তাঁর দিকে দেওয়া। মোবাইল ফোন বা অন্য যা কিছু বিঘ্ন তৈরি করতে পারে, সব দূরে রাখতে হবে। নিশ্চয়তা দিতে হবে যে মানুষটি নিরাপদ এবং তাঁর কথাগুলো নিরাপদ থাকবে। মন খুলে বলতে দিতে হবে।

নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা—যে অভিজ্ঞতা ট্রমা তৈরি করে, কষ্ট ও ক্ষত তৈরি করে, সে কথা বলতে সাহস দরকার হয়। সেই সাহস তখনই পাবে, যখন সে নিরাপদ অনুভব করবে। কথা বলতে বলতে থেমে গেলে বা নীরব হলে, সেই নীরব সময়টায় তাঁর সাথেই থাকতে হবে নীরব হয়ে। অনেকে কান্নাকাটি করতে পারে, সেক্ষেত্রে কাঁদতে দিতে হবে। বোঝাতে হবে তাঁর কান্না, কষ্ট পাওয়া—সব কিছুই অর্থপূর্ণ। কাঁদতে পারা এক রকম অধিকার।

প্রতিদিনের জীবনে ভালো থাকার জন্য মেডিটেশন, ব্রিদিং এক্সারসাইজ, ব্যায়াম—এগুলো চর্চা করার জন্য উৎসাহিত করতে হবে। কারও অবস্থা জটিল বা ঝুঁকিপূর্ণ মনে হলে ডাক্তারের কাছে পাঠানো নিশ্চিত করতে হবে। পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা রাখতে হবে সবাইকে। মানসিকভাবে সুস্থ থাকলে সমাজে ও দেশে অনেক সমস্যাই কমে আসবে। আমাদের পরিবেশ বসবাসের উপযোগী করতে হলে সবার আগে মানসিকতার পরিবর্তন প্রয়োজন।

মানুষের আবেগ বুঝতে গেলে মানুষকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হয়। কেউ উত্তেজিত হয়ে পড়েন, কেউ নীরব থাকেন; কারও সামান্য কথায় অনেক কষ্ট হয়, আবার কেউ অনেক বড় বড় ঘটনা মেনে নেন নীরবে। মানুষের মতোই তাঁর সমস্যাগুলোও অনেক রকম। জীবনের ছোট-বড় আঘাতে মানুষ পিছিয়ে পড়ে। তাই শুনতে হবে। মানুষের সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো শুনতে পারলে তখনই সমস্যার প্রকৃত সমাধান সম্ভব। প্রতিটি মানুষের আছে সম্ভাবনা, আছে সুস্থভাবে বাঁচার অধিকার। জীবনে ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা যেন থামিয়ে না দেয় কাউকে; শুনতে হবে গভীর মনোযোগের সাথে। মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় আগে থেকেই সচেতন থাকলে সমস্যা থাকবে অনেক দূরে।
লায়লা আরিয়ানি হোসেন
লাইফ কোচ ও মেডিটেশন প্রশিক্ষক,
উপস্থাপক, বাংলাদেশ বেতার।

শেয়ার করুন...




©All rights reserved Magura Protidin. 2018-2022
IT & Technical Support : BS Technology